ইউরোপের বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি ও কিছু না বলা ইতিহাস

চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়া বা ইউরোপে ছাত্র থাকাবস্থায় শিক্ষার্থীকে কি ধরনের বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয় তা বাংলাদেশে বসে অনুমান করা কষ্টসাধ্য; অনেক শিক্ষার্থী মনে করে কোনোরকমে সেঞ্জেনের যেকোনো একটা দেশে ঢুকতে পারলেই হয়, তারপর অন্য একটি ভাল দেশে চলে যাওয়া যাবে।

যারা এইভাবে কোনরূপ ভিসা ছাড়া অন্যত্র চলে যায় শেষ পর্যন্ত তাদের ভবিষ্যৎ কি হয়?

ছাত্র থাকাবস্থায় আপনি চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়া তথা ইউরোপে মাসে কত আয় করতে পারবেন?

কিভাবে আপনার ভিসা স্টাডি থেকে অন্য ভিসায় কনভার্ট করবেন? বা কিভাবে নিজেকে সেটেল করবেন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে এই আর্টিকেলে আলোচনা করা হয়েছে।

যেহেতু অনেক গুলি টপিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে স্বাভাবিক কারনেই আর্টিকেলটি একটু বড় হয়েছে। তবে আমার বিশ্বাস আর্টিকেলটি পড়ার পর আপনি নিজেই একজন কনসালটেন্ট হয়ে যেতে পারবেন। ভবিষ্যতে কোনও কনসালটেন্ট এর সাথে যুক্তি দিয়ে কথা বলতে এই লেখাটি যথেষ্ট কাজে দিবে। সুতরাং অনুরোধ রইল সময় নিয়ে লেখাটি পড়ার জন্য।

১। সাধারণত বাংলাদেশি  ছাত্রদের বিদেশে যাবার উদ্দেশ্য কি পড়াশোনার নাকি অন্যকিছুঃ

ইউরোপে স্টাডি ভিসা নিয়ে আসব এবং পাশাপাশি আয় করব এই ধরনের চিন্তা বাংলাদেশিরা   শিক্ষার্থীর মাঝে সবসময় লক্ষ করা যায়। খুভ কম সংখ্যক বাংলাদেশিরা   শিক্ষার্থী চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়া বা ইউরোপে শুধুমাত্র পড়াশোনার উদ্দেশ্য নিয়ে আসে। এর মধ্যে কিছু আছে প্রথমে তার ভিতরে পড়াশোনার উদ্দেশ্যটা থাকে। কিন্তু চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়া বা ইউরোপে আসার পর মাথায় শুধু আয় উন্নতির কথা ঘুরতে থাকে ফলে তারাও পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়। আমরা  বাংলাদেশিরা    খুভ কম সময়ের মধ্যে ভাল ফিডব্যাকের আসা করি যেটা কখনও মঙ্গল নয়। আমাদের গোল সবসময় সর্টটার্ম হয়ে থাকে। এরফলে আমাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভাল কিছু করতে পারি না।

আমার দেখা ইউরোপে পড়তে আসা কিছু ছাত্রের বাস্তব চিত্র আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছিঃ

কেইস স্টাডি ১

নাম রুদ্র(ছদ্ম নাম)। ইউরোপে পড়াশোনার জন্য মাস্টার প্রোগ্রামে এসেছিল। ইউরোপে আসার পর থেকেই তার ভিতরে এক ধরনের অস্তিরতা কাজ করেছিল। কবে মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করব। কবে বড়লোক হব এই নিয়েই সারাদিন দিন থাকত। আমি একটি কাজ মেনেইজ করে দিয়েছিলাম ঘন্টা প্রতি ৭৫ ক্রনা পাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশি  টাকায় ২৪০ টাকা। ২ দিন কাজ করে মিঃ রুদ্র আমাকে বলল এত কম টাকার কাজ আমার পুষবে না। এর ১৫ দিন পর রুদ্র ঠিক করল সে ফ্রান্সে তার এক দুঃসম্পর্কের চাঁচার কাছে চলে যাবে। ফ্রান্সে নাকি অনেক টাকা আয়ের সুযোগ রয়েছে। আমি তাকে বললাম সেখানে তুমি কিভাবে থাকবে মানে কোন ভিসা নিয়ে ফ্রান্সে থাকবা?

উত্তরে বলল এসাইলেম বা রাজনৈতিক আশ্রয় এর জন্য আবেদন করব। রুদ্রর কথা শুনে মনে হল ফ্রান্সে এসাইলেম কেইস এপ্রুভ হওয়া একেবারে সহজ ব্যাপার। যেকেউ এটা পেতে পারে। যাইহোক অতঃপর সে প্যারিসে গিয়ে উঠল। সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য যে সকল ডকুমেন্ট প্রয়োজন সকল কিছু প্রস্তুত করতে লাগল।

নোটঃ রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আপনাকে যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে কেন আপনি আপনার দেশে নিরাপদ নন।

এক ফরাসি  আইনজীবী রুদ্র কে বলল দেখ অনেকে অনেক রাজনৈতিক আশ্রয়ের কেইস দিচ্ছে কিন্তু একটাও সফল হচ্ছে না। কারন ফরাসি  সরকারের কাছে তা যৌক্তিক মনে হচ্ছে না। সুতরাং তোমাকে একটি ইউনিক কেইস তৈরি করতে হবে যা অন্যদের চেয়ে আলাদা। রুদ্র অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করল সে নিজেকে সমকামী দাবি করবে এবং বলবে তার এই সম্পর্ক বাংলাদেশ সরকার – সমাজ মেনে নেয় নি এবং উগ্রবাদী ইসলামী গোষ্ঠী বিভিন্ন সময় তার উপর হামলা চালিয়েছে। সমকামী প্রমাণের জন্য সে আরেকজন বাংলাদেশি  ছেলে পেয়ে গেল যে কিনা রুদ্ররের মত রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য ঘুরছে।

ফাইনালি কেইস কোর্টে উঠল ৬ মাস পর ইন্টার্ভিউ তে তাদের ডাকল। ইন্টার্ভিউ ভাল হল না। এর পরের ইন্টার্ভিউতে এদের কেইস কে রিজেক্ট করে দিল। পরবর্তীতে আপিল করল কিন্তু আপিলে পূর্বের রায় বলবধ থাকল।

বিঃ দ্রঃ প্যারিসে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এসাইলেম এর জন্য আবেদন করছে। কিন্তু এর মধ্যে কেইস এক্সেপ্ট করবে মাত্র ১২ পারসেন্ট লোকের। ফরাসি  সরকারের এসাইলেম নেওয়ার একটা লিমিট থাকে ওরা ইচ্ছা করলেও বেশি কেইস একসেপ্ট করতে পারে না।

এর মাঝে এই কেইস চালাতে গিয়ে রুদ্রের প্রায় ৩ লক্ষ টাকা দেশ থেকে আনতে হল। আর প্রতি মাসে যে ৩৩০ ইউরো সরকারি ভাতা পেত তা থাকা-খাওয়া তে খরচ হয়ে যেত। রুদ্রর লিগেলি পার্ট টাইম জব করার কোন উপায় ছিল না। তারপরেও সে বিভিন্ন জায়গায় হকারি করেছে। সে যে কি কষ্ট বাস্তবে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। এই সময়টাতে তার মা মারা গিয়েছে। দুঃখের বিষয় সে যেতে পারে নাই। কিভাবে যাবে রুদ্র ত বলেই দিয়েছে বাংলাদেশ তার জন্য নিরাপদ নয়। এবং তার কাছে কোন ভিসাও ছিলা না। রিজেক্সানের পর ফরাসি  সরকার রুদ্রকে ফ্রান্স ত্যাগের আল্টিমেটাম দিয়েছে। রুদ্র তখন লরি দিয়ে বৈধ কাগজপত্রের আসায় পর্তুগাল চলে যায়। আজ প্রায় এক বছর ধরে পর্তুগালে সে কোন প্রকার বৈধ রেসিডেন্ট হবার কাগজ করতে পারে নাই। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অবৈধদের আবাস স্থল পর্তুগাল। সেখানে কোনপ্রকার কাজ নেই। আর যতসব মাফিয়াদের আখরা হল পর্তুগাল। সেখানে বাংলাদেশিরা অনেক কষ্টে আছে। সে এক বিভীষিকাময় পরিস্তিতি। অনেকটা টাকা দিয়ে দাসত্ব কিনার মত।

পর্তুগালে প্রায় সবার ধান্দা শুধু ওয়ার্ক পারমিট বিক্রি করা। মানে হচ্ছে পর্তুগালে বৈধ হতে হলে আপনাকে কোন মালিকের আন্ডারে ওয়ার্ক পারমিট নিতে হবে। এই সুযোগে সেখানে বাংলাদেশি  ইন্ডিয়ান পাকিস্তানীরা ২,০০,০০০-৩,০০,০০০ টাকার বিনিময়ে ওয়ার্ক পারমিট বিক্রি করছে। আপনারা কেউ এটা ভাইবেন না যে, টাকা দিয়ে ওয়ার্ক পারমিট কিনেছে ভাল কথা,এর ফলে সেখানে একটা কাজের ত ব্যবস্থা হল। না ভাই ভুল। কাজ ছাড়া ওয়ার্ক পারমিট আপনাকে দিবে। আপনাকে কি কাজ দিবে ঐ মালিকের কোন কাজ নেই বা মন্দা ব্যবসা।

সর্বশেষ আমি রুদ্রের কোন খোজ জানি না। শুনেছি বাংলাদেশে চলে গিয়েছে। মাঝখানে সে বাংলাদেশে চাকরির  বয়সও হারাল।

কেইস স্টাডি ২

নাম কিরণ (ছদ্ম নাম)। প্রায় ৫ বছর ইউকে ছিল। ইউকে ইমিগ্রেশন পলিসি পরিবর্তন করায় বাংলাদেশে ফিরে যায়। স্টাডি ভিসা নিয়ে চেক পরজাতন্ত্রে চলে আসে। আসার পর চিন্তা করল পর্তুগালে চলে যাবে কেননা সেখানে নাকি ৫ বছর পর পাসপোর্ট পাওয়া যায়।

যাইহোক পর্তুগালে সে চলে যায় এবং বৈধ বসবাসের জন্য আবেদন করে। ৮ মাসের মাথায় তার টেম্পোরারি ভিসা এপ্প্রুভ হয়। এই ভিসা পেতে ৮ মাসে তার খরচ হয়েছে ৫,০০,০০০ লক্ষ টাকা। প্রতি মাসে ট্যাক্স পে করেছে ১৭০ ইউরো সাথে ২,৫০,০০০ টাকা দিয়ে ওয়ার্ক পারমিট কিনেছে। যেহেতু কোন কাজ নেই এই ৮ মাস বাড়ি থেকে টাকা এনে চলেছে। শুনেছি এখন নাকি পর্তুগালে কৃষি কাজ করে। গ্রীষ্মে পর্তুগালে অনেক গরম পড়ে। সূর্যের এই তাপ নিয়ে তাকে দৈনিক ৮-১০ ঘণ্টা মাঠে কাজ করতে হয়। প্রতি মাসে পাচ্ছে ৪০০ ইউরো। খাবার থাকা খাওয়া বাদ দিলে বাকি থাকে ৫০-১০০ ইউরো। আর এটা হাত খরচেই চলে যায়। বর্তমানে না পারছে দেশে যেতে না পারছে পর্তুগালে বিজনেস দিয়ে ওয়ার্ক পারমিটের ব্যবসা করতে।

কেইস স্টাডি ৩

নাম অমিত (ছদ্ম নাম)। স্টাডি ভিসা নিয়ে ইউরোপে চলে আসে। সে কখনো সখনো ক্লাসে যায়। তবে ফুল টাইম কাজ করে। সে আবার ঐ সব ফ্রান্স পর্তুগালে গিয়ে অবৈধ হওয়ার দলে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়কে কে মেনেইজ করে ফুল টাইম কাজ করে। প্রতি সপ্তাহে ২ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। তার উদ্দেশ্য পড়াশোনা নয়। কোনরকমে ২ বছর কাটিয়ে স্টুডেন্ট ভিসা থেকে বিজনেস ভিসায় গিয়ে, সে এখানে ব্যবসা বাণিজ্য করবে। কারণ ইউরোপে ২ বছর থাকার পর ছাত্ররা তাদের ভিসা কনভার্ট করে বিজনেস অথবা ওয়ার্ক পারমিটে চলে যেতে পারে।

অমিত এই দুই বছরে শুধুমাত্র ভিসা ঠিক রাখার জন্য নামে মাত্র ক্লাস করেছে এবং মাসিক ৬৫০-৭০০ ইউরো আয় করেছে। ফুল টাইম কাজের ফলে সে কোন প্রকার সার্টিফিকেট অর্জন করতে পারে নাই। দুই বছর পূর্ণ হবার পর সোল প্রপাইটারসিপে ভিসা কনভার্ট করেছে। বর্তমানে সে কফলেন্ড নামক সুপার শপে ঘণ্টা প্রতি ৩৮০ টাকা করে কাজ করছে। প্রতি দিন ১০ ঘণ্টা করে কাজ করতে হয়। এই দুই বছরে সে খুব ভাল চেক ভাষা শিখেছে যার ফলে এই ধরনের সুপার শপে কাজ পেয়েছে।

নোটঃ বিজনেস ভিসা কনভার্ট করতে বিজনেস দেখান লাগে না। কারন আপনি নিজেকে উদোক্তা হিসাবে স্ব স্ব দেশের সরকারকে দেখাবেন। নিজেকে উদোক্তা প্রমাণ করতে হলে আপনাকে প্রথমত কগজে কলমে একটি প্রতিষ্ঠান খুলতে হবে। যার ফিসিকাল এক্সিসটেন্স প্রয়োজন নেই। তারপর প্রতিষ্ঠানের নামে ২ বছরের জন্য ইসুরেন্স করতে হবে এবং লোকাল কোর্ট থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স নিতে হবে। এর সাথে আপনার ব্যাংক একান্টে ৪,০০,০০০ টাকা দেখাবেন। এই ধরনের বিজনেস ভিসা দিয়ে আপনি যে কোন মালিকের অধিনে সপ্তাহে ৫০ ঘণ্টা বৈধ ভাবে কাজ করতে পারবেন। ২ বছর পর আপনার স্টাডি ভিসা কনভার্ট করতে পারবেন। ভিসা কনভার্ট এর ক্ষেত্রে স্টাডি সম্পন্ন হওয়া আবশ্যক নয়। অর্থাৎ ২ বছর আপনাকে যেকরেই হোক ছাত্র থাকতে হবে তারপর ভিসা কনভার্ট এর সুযোগ পাবেন। চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়া খুভ অল্প টাকায় ব্যবসা করা যায়। যেমন আপনি ১০,০০০ ইউরো দিয়ে পুত্রাভিনি বা মিনি সপ খুলতে পারবেন

কেইস স্টাডি ৪

নাম আশরাফ (ছদ্ম নাম)। বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সের জন্য ইউরোপে আসে। আমার দেখা মতে তাকে তেমন কখনো খন্ডকালীন কাজ করতে দেখি নাই। সবসময় ক্লাস এবং গ্রুপ স্টাডি নিয়ে বেস্ত থাকত। তবে সপ্তাহে সে ২ দিন কাজ করত। সেটাও মিড টার্ম, ক্লাস টেস্টের সময়  বন্ধ থাকত। তার টিউসান ফি ছিল বছরে ২,০০,০০০ টাকা। একদিন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই আপনি মনে হয় ধনি পরিবার থেকে এসেছেন। এটা শুনে সে হেসে বলল হঠাৎ এই কথা কেন। এই যে আপনি তেমন পার্ট টাইম কাজ করেন না। আবার বাড়ি থেকে প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা আনছেন। এই জন্যই বললাম আর কি।

তখন সে আমাকে একটা হিসাব দিয়েছিল; দেখুন আমার কোর্স ফি দুই বছরে টোটাল ৪,০০,০০০ টাকা। এর মধ্যে ১,০০,০০০ টাকা ভিসার আগে দিয়েছি। বাকি ৩,০০,০০০ ৳ আমি নিজে দিচ্ছি। এই দুই বছরে আমি ২ টা সামার ভেকেসানের ছুটি পাব। অর্থাৎ ৬ মাস ফুল টাইম কাজ করতে পারব। প্রতি মাসে আমি যদি সব কিছু বাদ দিয়ে ৩৫,০০০ টাকা সেভ করতে পারি তাহলে ৬ মাসে ২,১০,০০০ এর মত। আর বাকি ৯০,০০০ টাকা যা শেষ সেমিস্টারের ফি ; হয়তো এই টাকা নিজে মেনেইজ করব নয়তো দেশ থেকে আনব। আর আমি এখন প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা পরিবার থেকে নিচ্ছি,  টোটাল ২ বছরে ২,৪০,০০০ টাকা পরিবার থেকে আনা হবে। এই ১০,০০০ দিয়ে আমার রুম ভাড়া এবং আনুসাঙ্গিক খরচ হয়ে যায় আর খাবারের টাকা সপ্তাহে কিছু কাজ করে মেনেইজ করছি। তুমি এবার হিসাব কর মাস্টার্স করতে আমার টোটাল কত গেল। আমি বললাম ৫,৫০,০০০ ৳ এর মত।

উত্তরে তিনি বললেন বাংলাদেশে বেসরকারি বা পাবলিকে ইএমবিএ করতে গেলে দুই বছরে সকল খরচ মিলিয়ে ৬,০০,০০০ ৳ লেগে যেত। আবার দেখ অনেকে যারা টিউসান ফি বেশি দিয়ে এসেছে তারা কিন্তু মাস্টার্সে প্রথমেই বিশ্ববিদ্যালয় কে ৪,০০,০০০ ৳ লক্ষ দিয়েছে। আরও ত বাকি বছরের টিউসান ফি এবং আনুসাঙ্গিক খরচ আছেই। আর আমি মনে করি এই টাকা তুলতে আমার ১ বছরও লাগবে না।

সত্যি সেদিন তাঁর এই ধরনের কেল্কুলেসান এবং লং টার্ম গোল দেখে অনেক অবাক হলাম এবং আমারও নিজের ভিতর অনেক স্পৃহা কাজ করল। আসলে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সবাইকে এমন কেল্কুলেটিভ হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে তিনি চেক প্রজাতন্ত্রের একটি ফার্মাসিটিউকালে এডমিনে জব করছেন। মাসিক বেতন ১,৫০,০০০ (টাকা) উপরে পাচ্ছেন।

উল্লেখ তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি চেক ল্যাঙ্গুয়েজটা ভালভাবে রপ্ত করেছিলেন। যারফলে আজ এই ধরনের অউটপুট পেল।

৩। চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়ায় ছাত্ররা ঘণ্টায় কত করে অয়েজেস পায় এবং পড়াশোনা অবস্থায় কাজ করে টিউসান ফি প্রদান করা সম্ভব কিনা?

কিছুদিন আগে আমি ঢাকার কিছু কনসালটেন্সিতে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ভাই আমি চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়া যেতে ইচ্ছুক, সেখানে কত আয় করা যাবে, সে বলল চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়া অনেক ধনি দেশ এখানে আপনি পড়াশোনার পাশাপাশি মাসে ১,০০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকা খুব সহজেই আয় করতে পারবেন। আর স্টাডি শেসে ২,০০,০০০ লক্ষ এর উপর আয় করতে পারবেন। আমি বললাম ভাই চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়া ত মধ্যম আয়ের দেশ এখানে কি এই পরিমাণ টাকা পড়াশোনার পাশাপাশি আয় করা সম্ভব? উত্তরে বলল আপনি ঐ দেশে ছিলেন না তাই জানেন না আমাদের সকল ছাত্র এই পরিমাণ টাকায় আয় করছে।

আসলে সত্যিটা হল এই পরিমাণ টাকা চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়া কেন পৃথিবীর কোন দেশেই পড়াশোনা অবস্থায় সম্ভব নয়। আরেকটা কথা মনে রাখবেন আপনাদের হয়ত কিছু রিলেটিভ ইউরোপে থাকে। তারা হয়তো আপনাদেরকে বলে থাকতে পারে। যে প্রতি মাসে তারা ১,৫০,০০০ এর অধিক আয় করছে। তাদের কথায় নাচবেন না বা দিবা স্বপ্ন দেখবেন না। কারন বিদেশে যারা থাকে প্রায় মানুষ তাদের আয় নিয়ে মিথ্যা বলে যদি আয় করে ৫০,০০০ টাকা বলেবে ১.৫০,০০০ ।

চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়ায় লিভিং কস্ট যথেষ্ট কম সে অনুযায়ী আপনি সপ্তাহে ৩ দিন কাজ করে নিজের খরচ চালাতে পারবেন তবে টিউসান ফি এর বড় অংশের টাকা দেশ থেকে আনতে হবে। ইতিমধ্যে বলেছি চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়া মধ্যম আয়ের দেশ এখানে আপনি ঘণ্টা বাংলাদেশি  টাকায় ২০৮-৩২০ টাকা। তবে বেশিরভাগ ছাত্র ২০৮ টাকা করে পায়। কেউ যদি আপনাদেরকে এর চেয়ে বেশি অয়েজেস পাওয়ার কথা বলে,আমি বলব সে একজন মিথ্যাবাদী।

তবে বড় বড় শহরে কাজের সহজলভ্যতা বেশি। কাজের জন্য লোকাল ভাষা জানতে হয় না। কারন ইউরোপের বড় বড় শহরগুলি টুরিস্ট এরিয়া এখানে সবসময়য় টুরিস্টদের আনাগোনা থাকে যার ফলে লোকাল ভাষার পাশাপাশি ইংরেজির ব্যাবহার ৮০ ভাগ হয়ে থাকে।

যেহেতু অয়েজেস কম সে অর্থে আপনাকে টিউসান ফি এর সম্পূর্ণ টাকা দেশ থেকে নিতে হবে। যদি কেউ বলে কাজ করে টিউসান ফি দেওয়া সম্ভব। আমি আবারও বলব সে আপনার সাথে মিথ্যা বলছে।

৪। পড়াশোনা অবস্থায় আপনাকে কি ধরনের পার্ট টাইম জব করতে হবে

আপনি যত বড়ই শিক্ষিত হন না কেন ইউরোপে প্রথমে আসলে আপনাকে নিন্ম মানের কাজ বা অড জব করতে হবে।

যেমনঃ বেশির ভাগ স্টুডেন্ট রেস্টুরেন্টে কাজ করে সেক্ষেত্রে আপনাকে কিচেনে ক্লিনারের কাজ করতে হবে, সকল থালা বাসন ক্লিন করতে হবে। ধিরে ধিরে লোকাল ল্যাংগুয়েজ শিখতে পারলে হয়ত ওয়েটারের কাজ পেতে পারেন। এমাজান, ডিএইছএল এ ডেলিভারি ম্যানের কাজ পেতে পারেন। বিভিন্ন পুত্রাভিনি( মিনি শপ) তে সেলস ম্যান বা ক্যাশিয়ারের কাজ পেতে পারেন। রাস্তায় রাস্তায় পত্রিকা বিক্রি করতে পারেন। এই সব শুনে আবার কেউ নিরুৎসাহি হবেন না। এই কাজ প্রায় সকল দেশের ছাত্ররা পার্ট টাইম হিসাবে করে। বিদেশে কাজকে কেউ ছোট করে দেখে না।

৫। চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়ায়  প্রতি মাসে থাকা-খাওয়া বাবদ আপনার কেমন খরচ হতে পারে

ইউরোপের তুলনায় চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়ায় লিভিং কস্ট যথেষ্ট সাশ্রয়ী। এখানে থাকা খাওয়া সম্পন্ন করতে আপনাকে তেমন বেশি খরচ করতে হবে না। খুব অল্প টাকায় সব কিছু ভালভাবেই শেষ করতে পারবেন। লিভিং কোস্ট নির্ভর করে আপনার জীবন যাপন কি রূপ হবে তার উপর। তবে চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়ায় প্রতি মাসে ১৬০০০- ১৯০০০ টাকা খরচ হবে। তারপরেও মাসিক অনুপাতে তার একটা আনুমানিক কিছু হিসাব দিচ্চি।

১। বাসস্থানঃ ৭৩৬০ টাকা।

২। ফুডঃ ৮০০০ টাকা। (যদি আপনি প্রতি সপ্তাহে ৩ দিন রেস্টুরেন্ট কাজ করেন সেখানে খাওয়া ফ্রি পাবেন সেক্ষেত্রে ফুড বাবদ খরচ আরও কম হবে এবং উপরুক্ত ফুড কোস্টটি যারা নিজে রান্না করে খাবেন তাদের জন্য)।

৩। যাতায়াতঃ ৮০০ টাকা। ছাত্ররা ট্রাম, মেট্রো, বাসে চলাফেরার জন্য ডিস্কাউন্ট পেয়ে থাকে।

৪। শিক্ষা সরঞ্জামঃ ৭০০ টাকা।

৪। নাইটক্লাব টিকেটঃ ছাত্রদের কে ISIC কার্ড দেওয়া হয়, যদি এটা আপনার থাকে তাহলে বিনামূল্যে প্রবেশ করতে পারবেন।

৫। থিয়েটার টিকেটঃ ১৭২ টাকা।

৬। মুভি টিকেটঃ ১৭২ টাকা।

৭। বিয়ারঃ প্রতি ক্যান বা বোতল ২৬ টাকা।

৮। সিগারেটঃ প্রতি প্যাকেট ২৫৬ টাকা।

বিঃদ্রঃ প্লিয ড্রিংকস, নাইট ক্লাবের হিসাব দিয়েছি বলে এটাকে অন্যভাবে নিবেন না। অনেকেই এখানে এসে তাদের লাইফ স্টাইল ফলো করে। সেই অর্থেই এই সমস্ত জিনিসের হিসাব দিয়েছি।

উপরুক্ত খরচ গুলি বাস্তবিক প্রেক্ষাপট থেকে নিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে মনগড়া কোন কিছুর হিসাব দেওয়া হয় নাই। ইউরোপে আসার পর একটা জিনিস মনে রাখবেন এখানে নারী সঙ্গ খুব সহজেই পাওয়া যায় বা হাতের নাগালেই আপনার নিকটস্ত মেয়ে ক্লাস মিটকে গার্ল ফ্রেন্ড বানাতে পারবেন বা লিভ টুগেদার করতে পারবেন। যারা এইসব করবেন তাদের ক্ষেত্রে এই হিসাব কার্যকরী নয়। এখানে গার্ল ফ্রেন্ড বানানোর অর্থই হল পকেটের টাকা শেষ করা। আর ড্রিংকস নিয়ে কিছু বলবনা ড্রিংকসের দাম এখানে পানির দামের চাইতেও সস্তা।

পরিশেষ এটাই বলব, আমার দেখা কিছু বাস্তব চিত্র আপনাদের সামনে তুলে দরলাম। আপনাদের পরিচিত কেউ ইউরোপে থাকলে তারা আমার এই ধরনের কেইস স্টাডির সত্যতা খুঁজে পাবে।

দেখুন চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়ায় একটি মধ্যম আয়ের দেশ আপনি চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়ায় জার্মানি, সুইডেন, ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া, ফিনল্যান্ড, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস প্রভৃতি দেশের সাথে তুলনা করলে ভুল করবেন। চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়ায় যদি পর্তুগাল, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, গ্রিস, লিথুনিয়া, লাটভিয়া, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি প্রভৃতি দেশের সাথে তুলনা করলে অবশ্যই চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়া এদের সবার শীর্ষে থাকবে।

তারপরেও যারা খুব উচ্চাবিলাসী তারা চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়ায় না যাওয়াটাই ভাল। তার সাতে এটাও ঠিক প্রথম সারির ইউরোপের দেশে ঢুকতে হলে আপনার যোগ্যতা ভাল হতে হবে পাশাপাশি ব্যাংকে ব্লক টাকা দেখানোর মত আর্থিক সামর্থ্যের প্রয়োজন রয়েছে।

এই স্টাডি থেকে শিক্ষার্থীকে ডিসিসান নিতে হবে তার কোন পথে যাবে। তবে আমরা মনে করি সর্বশেষ ৪ নং কেইস স্টাডি ফলো করলে সত্যি ভাল কিছু করা সম্ভব হবে। তবে ভুলেও কেইস স্টাডি ১ এবং ২ এর মত এমন আত্মাহুতি সিদ্ধান্ত নিবেন না। দেখেন স্টাডি ১ এবং ২ এর রুদ্র-কিরণ বেশি আয়ের জন্য বা তারাতারি পাসপোর্ট পাবার জন্য কত কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হল। এর চেয়ে চেক প্রজাতন্ত্র/স্লোভাকিয়া/স্লোভেনিয়া/এস্তোনিয়ায় থেকে গেলে হয়ত তাদের জীবনটা অন্যরকম হতে পারতক।

মন্তব্যসমূহ

Facebook