এইচ এস সি পাশ করে ব্যাচেলর প্রগ্রামে ইউরোপে যাওয়টা কতটা যোক্তিক?

আজ কিছু গুরুত্ব পূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। আশাকরি আপনাদের কিছুটা হলেও কাজে আসবে। হেডিং দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন লেখাটি মুলত ব্যাচেলর প্রাগ্রাম নিয়ে। আশাকরি আর্টিকেলটি আপনার ইউরোপে  পড়াশোনার পরিকল্পনা পরিবর্তন হতে পারে।

প্রতি বছর বহু শিক্ষার্থী এইচ এস সি পাশ করে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে  উচ্চশিক্ষার  জন্য ভর্তির সুযোগ চাচ্ছে।  আমাদের পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত আসনের কারনে এই বিশাল সংখ্যক বেশীরভা শিক্ষার্থীকে ভর্তির সুযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।  ফলাফল পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমুল ভর্তি যুদ্ধ। এই যুদ্ধে দেশের মোট (এইচ এস সি পাশ কৃত) শিক্ষার্থীর অল্প সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির সুযোগ পায়।

এমতাবস্থায় পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পাওয়া শিক্ষার্থীরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সুযোগ নেয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মোটামুটি দেশের বড় একটি অংশ কে ভর্তির সুযোগ করে দেয়। আর্থিক সামর্থ্যবান পরিবারের সন্তানেরা  প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ নেয়।

উপরের এই তিন ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীর মধ্যে কেউ কেউ আবার দেশের বাহিরে বা ইউরোপে উচ্চশিক্ষায় যেতে চায়। মূলত তারাই আমার আজকের লেখার একটি বিষয়।

যে যেভাবে যেখানে পড়ুক সমস্যা নেই। লক্ষ্য রাখতে হবে,  যেভাবেই হোক গ্রেজুয়েসান সম্পন্ন করতে হবে।  মাত্র ৪ বছরের পড়াশুনা শেষ না করতে পারলে বিগত ১২ বছরের শ্রম অনেকটাই বৃথা হয়ে যায়।

প্রথমে আলোচনা করব, এইচ এস সি পাশ করে ব্যাচেলর প্রগ্রামে ইউরোপে   যাওয়টা কতটা যোক্তিক?

১। দেশের প্রায় ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী বাংলা মিডিয়াম থেকে এস এস সি এবং এইচ এস সি সম্পন্ন করে। এরফলে অনেকের ইংরেজি মিডিয়ামে পড়াশুনার অভিজ্ঞতা নেই এর পাশাপাশি ইংরেজিতে দুর্বলতা ও রয়েছে। আমরা জানি যে, বাংলাদেশের পাব্লিক/প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে  ইংরেজি মিডিয়ামে পড়াশুনা করানো হয়(  সোশ্যাল সাইন্স বা হিউমিনিটিস ফ্যাকাল্টির কিছু সাব্জেক্ট এখনো বাংলায় রয়েছে)। অর্থাৎ বুঝতে পারছেন আপনি না চাইলেও আপনাকে ইংরেজি মিডিয়ামেই ব্যাচেলর করতে হবে।  তবে এখানে ভয়ের কিছু নেই। প্রথম ১ টি বা ২ টি সেমিস্টার হয়ত কিছুটা ওলট পালট মনে হতে পারে তবে তৃতীয় সেমিস্টার থেকে আপনি একেবারে ইউজ টু হয়ে যাবেন। এর কারন হল আপনি ইংরেজি তে দুর্বল হলেও চারপাশের পরিবেশ আপনাকে দুর্বল থাকতে দিবে না। শিক্ষকের পাঠদান ইংরেজিতে। আপনি শিক্ষকের কোন কথা না বুজলেও সমস্যা নেই, ক্লাস শেষ হবার পর আপনার পাশের বন্ধু থেকে বাংলা তরজমা সহ বিস্তারিত বর্ণনার সাহায্য পাবেন, এরপর বাসায় উক্ত টপিকের লেসনটি খুলবেন দেখবেন আপনি সব কিছু ভালভাবেই বুঝতে পারছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আপনাকে বিভিন্ন বিষয়ের উপর এসাইনমেন্ট দিবে, আপনাকে এসাইনমেন্ট তৈরির জন্য গুগুলের এই প্রান্ত থেকে অই প্রান্ত ঘাটা ঘাটি করতে হবে। ফলাফল,  ইংরেজি সহ নতুন বিষয়ের উপর এক ধরনের প্রশিক্ষণ পাবেন যেটা আপনার ইংরেজি দক্ষতা অনেকাংশে বাড়াবে। এর পর ক্লাস টেস্ট, কুইজ টেস্ট, মিড টার্ম, প্রেসেন্টেসান এর মত পরীক্ষা গুলির সাথে আপনাকে মুখোমুখি হতে হবে। এইভাবে ১ /২ সেমিস্টার পর আপনার ইংরেজির উপর যেই ভয় ছিল তা দেখবেন একেবারেই কেটে গেছে, এভাবে আপনি একজন গ্র্যাজুয়েট হয়ে উঠাবেন।

২।  আপনারা কি জানেন বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে যারা ব্যাচেলর করার জন্যে গিয়েছে এদের মধ্যে বেশিরভাগ  শিক্ষার্থী তাদের পড়াশুনা শেষ করতে পারে নাই। আমার কথা টি হয়ত আপনাদের কাছে কিছুটা অবিশ্বাস্য হতে পারে। তবে এটাই বাস্তব।

এবার আসুন এর কারন খুজি , কেন বাংলাদেশি (এইচ এস সি পাশ কৃত) ছাত্ররা ইউরোপে পড়াশুনা শেষ করতে পারে নাঃ

ক। ইতিমধ্যে আমি বলেছি যে, বাংলা মিডিয়ামে পড়াশুনার ফলে অনেকেই  ইংরেজিতে তেমন দক্ষ না।  ইউরোপে একজন এইচ এস সি পাশ কৃত শিক্ষার্থীর মূল সমস্যা হল ভাষাগত। শিক্ষক আপনাকে যাই পড়াবে তা সহজে মাথায় ঢুকবে না। আপনার পাশের বন্ধুটি অন্য ভাষাভাষী হবার ফলে আপনি তার থেকে বাংলায় এর তর্জমা বুজে নিতে পারবেন না।  ফলাফল স্টাডি থেকে মনোযোগ উঠে যাওয়া।

খ। ইউরোপে এইচ এস সি পাশ কৃত ছাত্রদের মূল বাঁধা হল, সার্টিফিকেট রিকোগ্নাইজ করা। সার্টিফিকেট রিকোগ্নাইজেসান হল একটি ডিক্লারেসান লেটার, যেটা ইউরোপীয় ইউনিভার্সিটি বা স্ব স্ব দেশের এজুকেসান মিনিস্ট্রি দিয়ে থাকে। আপনার লাস্ট ডিগ্রি টি ইউরোপীয় ডিগ্রির সমতুল্য তার একটি একুয়াভেলেন্ট ডিক্লারেসান। এটাকেই সার্টিফিকেট রিকোগ্নাইজেসান বলা হয়। আপনি যদি এইচ এস সি পাশ হন, সেক্ষেত্রে ইউরোপে ব্যাচেলর করতে গেলে আপনার এস এস সি এবং এইচ এস সি সার্টিফিকেট কে রিকোগ্নাইজ করতে হবে । এর জন্য আপনাকে  এক্সাম দিতে হবে। যদি এই এক্সামে পাশ করেন তাহলেই আপনার রিকোগ্নাইজেসান কম্পলিট হবে। আর এই ধরনের রিকোগ্নাইজেসান এক্সাম পাশ করা অতটা সহজ নয়, যতটা আমরা মনে করি। (তার মানে এই নয় যে, এটা খুব কঠিন কিছু) তবে সবাই যে পাশ করে না তা বলা ভুল হবে। আমরা এমন অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে দেখেছি যারা ৩ বছর ধরে পড়াশুনা করছে এখন পর্যন্ত ২য় বর্ষে উঠতে পারে নাই । কারন,  সে এখনো নোস্ট্রিফিক্সান এক্সামে কৃতকার্য হতে পারে নাই। ইউরোপে  রিকোগ্নাইজেসান ছাড়া আপনি রেজিস্টার্ড ফুল টাইম স্টুডেন্ট হতে পারবেন না। শুধুমাত্র এই কারনেই অনেক ছাত্রের পড়াশুনার  বিচ্যুতি ঘটে।

গ। এইচ এস সি পাশ করা শিক্ষার্থীরা একটু বেশি বিলাসী হয়ে থাকে। ইউরোপে আসার পর অনেকেই নতুন নতুন ফোন কেনা শুরু করে, যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে একটি দামি ডিএসএলআর তাদের গোলায় জুলে। কেউ কি কখনো ভেবছেন ছেলেটা সবে মাত্র পড়াশুনার জন্য বিদেশে গেল হঠাৎ তার হাতে আই ফোন , ডি এস এল আর এবং  নতুন নতুন জামাকাপর কিভাবে আসল। বাড়ি থেকে ত সে লিমিটেড টাকা নিয়ে গিয়েছিল। এই টাকা দিয়ে এত কিছু করা সম্ভব নয়!!!

আসল রহস্য হল, এরা ক্লাস এবং বাসায় স্টাডি ফাঁকি দিয়ে দিনের পর দিন রেস্টুরেন্ট সহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছে, বিনিময়ে হাতে আইফোন গলায় ডিএসএলআর আর পড়নে ইউরোপিয়ান স্টাইলের জামাকাপর। এর ফলাফল পরীক্ষায় ফেল এবং ধীরে ধীরে পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ কমে গিয়ে টাকার পিছনে দৌড়ানো।

ঘ। ইউরোপের পাব্লিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়য়ের টিউসান ফি প্রায় একি রকম। প্রতি বছর টিউসান ফি হল ৩০০০-৪০০০ ইউরো পর্যন্ত। অর্থাৎ ৩ বছরে (কিছু ব্যাচেলর ইঞ্জিনিয়ারিং প্রগ্রাম ৪ বছর মেয়াদী হয়) বাংলা টাকায় ৯,০০,০০০-১২,০০,০০০ ৳ খরচ হবে। এই অর্থ অনেকেই সামাল দিতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে পড়াশুনার বিচ্যুতি ঘটে। আমাদের দেশের প্রায় সকল শিক্ষার্থী মনে করে ইউরোপে গিয়ে পার্ট টাইম কাজ করে টিউসান ফি মেনেইজ করব। যা বাস্তবিক অর্থে অসম্ভব। কারন আপনি বেশি ঘন্টা কাজ করতে গেলে আপনার পড়াশুনার ক্ষতি হবে আর পড়াশুনার ক্ষতি মানেই আপনি ডিগ্রি অর্জন থেকে দূরে সরে গেলেন। আরেকটি বিষয় বর্তমানে ইউরোপীয় দেশ গুলির( জার্মানি, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, ইউকে ব্যতীত) অর্থনৈতিক অবস্থা সেই আগের মত নেই যে পার্ট টাইম কাজের জন্য ভাল  অয়েজেস পাবেন।

ঙ। এইচ এস সি পাশ কৃত শিক্ষার্থী মানেই বুঝা যায় যে, সে একজন টিনএইজ । এই বয়সে আবেগ বেশি কাজ করে এবং নিষিদ্ধ বিষয়ের উপর আগ্রহ বেশি থাকে। ইউরোপে এমন অনেক নিষিদ্ধ উপাদান রয়েছে যা তাদের পড়াশুনা নস্ট করার জন্য যথেষ্ট। উদাহরণ সরূপঃ এলকোহল, মাদক, নারী, কেসিনো(জুয়া) ইত্যাদি।

চ। ব্যাচেলর প্রগ্রামে যথেস্ট সংখ্যক ক্লাস, প্রজেক্ট ওয়ার্ক, হোম ওয়ার্ক থাকে যার ফলে আপনি ইচ্ছা করলেও পার্ট টাইম কাজ করতে পারবেন না। কারন আপনি যেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন সেখানে পার্ট টাইম কাজের নিদ্রিস্ট শিডিউল থাকবে। ধরুন মঙ্গল বার আপনার ক্লাস দুপুর ১২ টায় সবসময় শেষ হয়। তাই আপনি মঙ্গলবার দুপুর ১টা বা ২ টা থেকে পার্ট টাইম কাজের শিডিউল পেয়েছেন। হঠাৎ একদিন আপনার শিক্ষক বলে উঠল আজ তোমাদের ক্লাস বিকাল ৪ টায় শেষ হবে। কারন আজ আমি তোমাদের সাথে প্রোজেক্ট নিয়ে আলোচনা করব বা অন্য কোন বিষয়। এমনটা হলে ন্যাচারেলি আপনি মঙ্গলবারে পার্ট টাইম কাজের স্থানে যেতে পারবেন না। এর ফলে আপনার মালিক আপনাকে কাজ থেকে টারমিনেট করবেই।

অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে যারা দেখেছে পড়াশুনা ভালভাবে কন্টিনিউ করলে শুধুমাত্র থাকা খাওয়ার টাকাটাও পার্ট টাইম কাজ করে মেনেইজ করা সম্ভব হয় না। তাই বাধ্য হয়েই পড়াশুনার বিচ্ছুতি ঘটে।

ছ। এই বয়সে দেশের বাহিরে এসে অনেকে হোম সিকনেসে ভোগে। যারফলে পড়ায় মন বসে না, বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে যেতে হয়। দেশে ফিরে যাওয়ার অর্থই হল, সময় এবং মন ২টি প্রচণ্ডভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং এই ধাক্কা সামাল দেবার মত মনমানসিকতা অনেক দুর্বল হয়ে পরে।

জ। এইচ এস সি পাশ করার পর ইউরোপে এসে কিছু শিক্ষার্থী হতাসায় ভোগে। এক এক দিন মাথায় এক এক প্লান ভর করে। অমক ভাই সুডেন থাকে এখানে কোন ফিউচার নাই, তাই সুইডেন গিয়ে এসাইলেম নিব। অমুক ভাই ফ্রান্সে ভাল আয় করছে তাই ফ্রন্সে চলে যাব। ফলাফল পড়াশুনার সমাপ্তি।

সুবিন্ধুর পরামর্শঃ

১। এইচ এস সি পাশ করে বেচেলর করার জন্য মোটেও ইউরোপে আসা উচিৎ নয়।

২। তারপরেও যদি যেতে চান, তাহলে অবশ্যই আপনার আর্থিক সক্ষমতা ভাল হতে হবে। অন্যথায় স্কলারশিপের জন্য সুযোগ খুঁজুন নয়তো দেশেই বাকি পড়াশুনা শেষ করুন। যদিও আন্ডার গ্র্যাজুয়েটে স্কলারশিপ পাওয়া কঠিন।

৩। ইউরোপে যাবেন ভাল কথা। টার্গেট থাকতে হবে পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরব। সত্যি বলতে কি পড়াশুনা শেষ করার পর ইউরোপ আপনার জন্য বেমানান। আপনার ডিগ্রি অনুযাই এক্সপেক্টেট লেভেলের জব পাওয়া অনেক মুশকিল হবে(ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর ব্যতীত) ।

৪। জীবনে টাকাই সব কিছু নয়, সেলফ রেসপেক্ট। আপনার পদবী,  পাশাপাশি দেশকে কিছুটা সারভ করার ভিতরই মূল সেটিসফেক্সান আসবে।

৫। বর্তমানে ইউরোপের দেশ গুলির অবস্থা অবস্থা অতটা ভাল নয়, যেখানে আপনি কাড়ি কাড়ি টাকা আয় করবেন। সে অনুযায়ী আপনি চাইলে বাংলাদেশে ইউরোপের চেয়েও ভাল জীবনযাপন করতে পারবেন।

৬। প্রায় শিক্ষার্থীরা ইউরোপে পড়া শেষ করে অড জব করছে, হয়ত তা নিকট আত্মীয় বা বন্ধুদের সাথে সেয়ার করে না। প্রশ্ন হল যদি আমাকে অড জব করতেই হয় তাহলে ১৭  বছর পড়াশুনা করার কি দরকার ছিল।

৭। এখনি সময় বিদেশ থাকে ভাল বিষয় আহরণ করব পরবর্তীতে দেশে  ইনভেস্ট করব।

মন্তব্যসমূহ

Facebook