উচ্চ শিক্ষায় ইউরোপ; কিছু দিক নির্দেশনা, পাল্টে যেতে পারে আপনার বর্তমান সিধান্ত

Higher Study Abroad From Bangladesh এই আর্টিকেলের মূল আলোচ্য বিষয়। বাংলাদেশি অনেক শিক্ষার্থীর ইউরোপে উচ্চশিক্ষা লাভের স্বপ্ন থাকে। কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনার অভাব রয়েছে অনেকের। সেজন্যে  আর্টিকেলের ব্যানারে হেডিং দিয়েছি “উদ্দেশ্য কোনটি ডিগ্রী অর্জন নাকি কামলার খেতাব অর্জন। সত্যি এটা খুব দুঃখজনক যখন একজন আন্ডারগ্রাজুয়েট শিক্ষার্থী পড়াশোনার উদ্দেশে গিয়ে, পড়াশোনা না করে ছোট মানের কাজকর্মে বেস্ত হয়ে পরে। বিষয়টি আরও দুঃখজনক হয়ে পরে তখনি, যখন দেখা যায় আমার দেশের গ্র্যাজুয়েট-পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী ইউরোপে গিয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে হয়ে যায় ফুল টাইম কামলা।

শুধুমাত্র ভুল সিদ্ধান্ত এবং higher study abroad বিষয়ে পরিস্কার ধারনার  অভাব এবং না জেনে বুঝে পা বাড়ানোর ফলে অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠিত জীবনের মৃত্যু ঘটে। এর জন্য আংশিকভাবে কিছু overseas education consultants in Bangladesh দায়ী। কিছু student consultancy firm in Bangladesh শিক্ষার্থীকে ভূল তথ্য এবং লোভনীয় স্বপ্নের কথা বলে, যার বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই। এখন অনেকে বলবে কাজ ত কাজ, এর আবার ছোট বড় কি! কথা সত্য, আমাকে যদি আজীবন হোটেলের ক্লিনার, অয়েটার হকারি করতেই হয় তাহলে কেনই বা এত পড়াশোনা করলাম এই ধরনের কাজের জন্য নিশ্চয়ই প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রীর প্রয়োজন নেই। বুঝতে হবে আমাদের পিছনে বাংলাদেশ সরকারের অনেক বিনিয়োগ রয়েছে। আমরা চাইলেই পরদেশে দাসত্ব করতে পারি না। টাকা উপার্জন দিয়ে সব কিছু পরিমাপ করা যায় না।

Higher Study Abroad নিয়ে বাংলাদেশের বড় একটি অংশের শিক্ষার্থী কেন ভাবে

  • আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরা মনে করে ইউরোপে গিয়ে অনেক টাকা আয় করা যাবে পাশাপাশি পড়াশোনাও করা যাবে।
  • গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরা পাস করার পর ডিসায়ার অনুযায়ী চাকরি না পেয়ে বাধ্য হয়ে ইউরোপে যাবার পরিকল্পনা করে। (এখানে কিন্তু ঢালাও ভাবে সবাইকে বোঝানো হয় নাই, এমন গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী রয়েছে যারা সত্যি ডিগ্রী অর্জনের জন্য যায় )
  • কিছু নামধারী শিক্ষার্থী আছে যারা কোন রকমে ইউরোপে যেতে পারাটা কে ধন্য মনে করে, পড়াশোনা শুধুমাত্র একটা বাহানা।
  • কিছু শিক্ষার্থী বাংলাদেশ কে সেইফ জোন মনে করে না তাই মূলত সেখানে সেটেল হবার জন্য যায়।

উদ্দেশ্য যাই হোক তবে মোক্ষম উদ্দেশ্য পড়াশোনা হক এটাই কাম্য।

ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ৩ টি স্তর রয়েছে।

  • ব্যাচেলর প্রোগ্রাম
  • মাস্টার প্রোগ্রাম
  • ডক্টরাল প্রোগ্রাম

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ৩ টি প্রোগ্রাম বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির আন্ডারে থাকে। তবে কিছু কিছু ফ্যাকাল্টি তে ডক্টরাল প্রোগ্রাম নেই। এই ৩ টি প্রোগ্রাম মূলত ২ টি ভাষায় পড়ানো হয়। প্রথমটি তাদের মাতৃভাষায় এবং দ্বিতীয়টি ইংরেজি ভাষায়। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ মানসম্মত শিক্ষা প্রদান, চমৎকার গবেষণার রেকর্ড এবং উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন অধ্যাপক হল এদের মূল নিয়ামক।

চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, এস্তোনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে  চোখ রাখলে বোঝা যায় এখানে প্রচুর কোর্স রয়েছে। সেখান থেকে কাঙ্ক্ষিত বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে পারবেন। প্রোগ্রাম বা কোর্স নির্বাচন করার পূর্বে একটি প্রশ্নের উত্তর জেনে নিতে হবে, আপনি যে পরিবারের সাথে বিলং করছেন তাঁরা কি আপনার ইউরোপে উচ্চ শিক্ষার খরচ বহন করতে পারবে? এখন হয়ত অনেকেই এটা ভাবছেন যে, পরিবারের সামর্থ্যের কি প্রয়োজন রয়েছে। ইউরোপে গিয়ে নিজের খরচ নিজেই ব্যবস্থা করব। যারা এই ধরনের দিবাস্বপ্ন দেখছেন তাঁরা সত্যি আবেগের ভিতরে আছেন, ইউরোপ কেন পৃথিবীর কোথাও পড়াশুনার খরচ খন্ডকালীন কাজ করে যোগান দেওয়া যায় না।

যদি কেউ বলে, সে ইউরোপে থেকে সকল খরচ নিজেই চালাচ্ছে তাহলে বুঝতে হবে এই শিক্ষার্থী পড়াশোনার ভিতরে নেই সে অড জবের বেড়াজালে বাধা পরে গিয়েছে।  কেন সকল খরচ যোগান দিতে পারবেন না এই নিয়ে ব্লগ সেকশনে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। যদি পরিবার আপানর খরচ যোগানে সামর্থ্য-বান হয় কেবল তখনি উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিন অথবা স্কলারশিপ প্রোগ্রামে যাবার চেস্টা করুণ।

 ব্যাচেলর এবং মাস্টার প্রোগ্রাম

সাধারণত ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর প্রোগ্রাম ৩ বছর মেয়াদী এবং মাস্টার্স প্রোগ্রাম ২ বছর মেয়াদী হয় তবে কিছু প্রকৌশল কোর্স ৪ বছর মেয়াদী রয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, এস্তোনিয়ায় প্রচুর ব্যাচেলর এবং মাস্টার্স  প্রোগ্রাম রয়েছে, তবে স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচেলর এবং মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তির যোগ্যতার ভিন্নতা রয়েছে। বর্তমানে ইউরোপীয় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে European Credit and Accumulation Transfer System (ECTS) চালু রয়েছে। ৩ বছরের ব্যাচেলর প্রোগ্রাম কে ১৮০ ইসিটিএস ধরা হয় এবং ২ বছরে মাস্টার্স প্রোগ্রাম কে ১২০ ইসিটিএস অর্থাৎ প্রতি সেমিস্টার ৩০ ইসিটিএস এবং প্রতি বছর ৬০ ইসিটিএস। ইসিটিএস নিয়ে বিস্তারিত তথ্য ব্লগ সেকশনে রয়েছে। যদি আপনার কোর্স ৪ বছরের হয় সেক্ষেত্রে আপনি ২৪০ ইসিটিএস সম্পন্ন করলেন।

এইচএসসি পাশকৃত শিক্ষার্থী

ইউরোপে উচ্চ শিক্ষা নেবার আকাঙ্ক্ষা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায় এইচএসসি পাশকৃত শিক্ষার্থীদের ভিতরে এবং সবচেয়ে বেশি ভিসা রিজেকশন হয় এই এইচএসসি  পাশকৃত শিক্ষার্থীদের। ১৮-১৯ বছর বয়সের একজন শিক্ষার্থী জানে না ইউরোপে উচ্চ শিক্ষার কি পরিবেশ বিরাজমান করছে, সে জানে না একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে কি ধরনের যোগ্যতার প্রয়োজন। বাংলা মিডিয়ামে পড়াশোনার জন্য কিছু শিক্ষার্থীর ইংরেজি তে কথা বলার দক্ষতার অভাব রয়েছে। এরা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত লো রেঙ্কড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ নেয়, আবার দেখা যায় কিছু শিক্ষার্থীর অনেক বছরের শিক্ষা বিরতি রয়েছে। এই সমস্ত কারণে এইচ এস সি পাশকৃত শিক্ষার্থীর ভিসা আবেদন বেশি প্রত্যাখ্যান হয়।

এইচএসসি পাশ করার পরের ১ টি বছরকে ক্রুসিয়াল সময় বলা হয়। কারো যদি ছোট বেলা থেকেই ইউরোপে ব্যাচেলর করার ইচ্ছা থাকে তাহলে তাঁকে অবশ্যই ক্লাস ৯-১২ পর্যন্ত এই নিয়ে টুকিটাকি রিসার্চ করতে হবে। কারণ শিক্ষার্থীকে জানতে হবে, আমি কেন যেতে চাই, কি ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নেওয়া উচিৎ, ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি যোগ্যতা কি কি ইত্যাদি। এইভাবে কেউ যদি পরিকল্পনা নিয়ে পদক্ষেপ নেয় আশাকরি সে সফল হবেই।

বাংলাদেশে জনসংখ্যার হার অনুপাতে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা খুব নগণ্য। তাই অনেক মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা ভাল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে বাধ্যে হয়ে যেনতেন মানহীন বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। যে যাই বলুক এর ফলাফল খুব একটা সুখকর হয় না।

বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর করতে হলে আপনাকে ৪ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়কে ৭-১০ লক্ষ টাকা ব্যয় করতে হবে এবং যেহেতু ঢাকায় থাকতে হবে সেহেতু এর জন্য আপনাকে প্রতি মাসে ৬,০০০-৮,০০০ টাকা গুনতে হবে।

আপনি কি জানেন ঠিক একি পরিমাণের টাকা খরচ করে আপনি ইউরোপীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতে পারেন। শুধু দরকার আপনার এবং পরিবারে মানসিকতার একটু পরিবর্তন। অনেক শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবারে ভিতরে এক ধরনের মিথ কাজ করে , ইউরোপে স্টাডি করার পাশাপাশি অনেক অর্থ আয় করা যায়। আর এই আয় দিয়ে শিক্ষার্থী তাঁর নিজের সকল খরচ চালাতে পারবে এবং মাঝে মধ্যে পরিবারকে কিছু কন্ট্রিবিউট করতে পারবে। এই ধরনের মিথ শিক্ষার্থীর জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়। পড়াশোনা টা কি এতই সহজ যে প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা ক্লাস করার পাশাপাশি আরও ৫-৭ ঘণ্টার পার্ট টাইম জব করে ক্লাস এটেন্ডেন্স, ক্লাস পারফর্মেন্স,পরীক্ষায় এভারেজ মার্কস পাওয়া যাবে!!  প্রতিদিন ৫-৭ ঘণ্টা পার্ট টাইম জব এবং ৫ ঘণ্টার একাডেমিক ক্লাস করার পর আপনার ভিতরে কি ঐ স্টেমিনা থাকবে!! যেটা দিয়ে আপনি বাসায় বসে এক্সারসাইজ করবেন।

দেশে থেকে ইউরোপে এসেছেন ডিগ্রী অর্জনের জন্য আর এখানে এসে হয়ে গেলেন ফুল টাইম কামলা। যেখানে বাংলাদেশে বসে আমরা একটা টিউশানি করে বাসায় পড়ার সময় পাই না। আর সেখানে আপনি ক্লাস,পরীক্ষার পাশাপাশি অড জবের করে কিভাবে ভাবছেন যে আপনি কোর্স সম্পন্ন করতে পাবেন। ইউরোপে ৫ ঘণ্টা কাজ করে আপনি মাত্র বাংলা টাকায় ১২০০-১৫০০ টাকা আয় করতে পারবেন এর বেশি কিছু না। এটা দিয়ে আপনার নিজের খরচ চালিয়ে টিউশন ফি দেওয়া সম্ভব নয়।

তাহলে এইচএসসি পাস কৃত শিক্ষার্থীরা কিভাবে তাদের পড়াশোনা চালাবে 

প্রথমে আপনি এবং আপনার পরিবারকে বুঝতে হবে যে, ইউরোপে পড়াশুনার করতে হলে বাংলাদেশের মত ইউনিভার্সিটির সকল খরচ বাসা থেকে দিতে হবে।   ইউরোপে স্টাডি ভিসার মানে কিন্তু এটা না যে, উচ্চ  শিক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি নিজের খরচ, ইউনিভার্সিটির খরচ পাশাপাশি পরিবারকে সাপোর্ট দেওয়ার সামর্থ্য অর্জন করা। বরং এইভাবে চিন্তা করুণ বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর করতে যেহেতু ৪ বছরে ৭-১০ লক্ষ টাকা খরচ হবে, সেহেতু আমি এই টাকা ইউরোপের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি হিসাবে ৩ বছর কোর্সে প্রদান করব। অর্থাৎ টিউশন ফি এর পেঁড়া আপনার মিটে গেল।

(বিঃদ্রঃ ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ বছরের কোর্সে আপনার বড়জোর ৭,০০,০০০-৯,০০,০০০ লক্ষ বাংলাদেশি টাকা খরচ হবে)

দ্বিতীয়, ঢাকায় থেকে পড়াশোনা করলে প্রতি মাসে পরিবার আপনাকে ৬,০০০-৮,০০০ টাকা দিতো। তাই এই টাকা আমরা ইউরোপে থাকা খাওয়ার জন্য খরচ করব। প্রশ্ন হল ইউরোপে প্রতি মাসে থাকা খাওয়ার খরচ কম করে হলেও ১৫,০০০-২০,০০০ বাংলা টাকা লাগবে। পরিবার থেকে যদি প্রতি মাসে ৭০০০ টাকা পাই বাকি ৮০০০ টাকা কিভাবে ব্যবস্থা করব?

এর সমাধান হল ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তাহে ৪-৫ দিন ক্লাস হয় আপনি যদি সপ্তাহে ২ দিন ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করেন তাহলে প্রতি মাসে ১৪০০০ বাংলাদেশি টাকা আয় করতে পারবেন। যেটা দিয়ে খুব সহজেই আপনার যাবতীয় খরচ চালাতে পারবেন এবং মাস শেষে উদ্বৃত্ত টাকা জমা রেখে দেন কারণ এমন অনেক সপ্তাহ আসবে যেখানে আপনার ক্লাস ওয়ার্কস , এসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট, পরীক্ষা সব মিলিয়ে অনেক ব্যস্ত থাকতে হবে, এরফলে ঐসকল সপ্তাহে অড জব বন্ধ রাখতে হবে।  তাছাড়া ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ তাদের সেমিস্টারের ফাইনাল এক্সাম শেষ করে বছরে ২ মাস সামার ভেকেশান ছুটি দেয়। এই ছুটি তে আপনি ইচ্ছা করলে প্রতি দিন ১২ ঘণ্টা করে কাজ করতে পারবেন।

কেল্কুলেটিভ অয়েতে চিন্তা করুণ ইনশাল্লাহ সফলতা আসবেই। এখন অনেকে হয়ত বলবেন ভাই আমার পরিবার থেকে টাকা নিয়ে পড়াশোনা করা সম্ভব না। এর অর্থ হল আপনার পরিবার নিশ্চয়ই বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনাকে পড়াশোনা করানোর পরিকল্পনা করছে না। যদি তাই হয় আপনি ইউরোপে ব্যাচেলর করার পরিকল্পনা বাদ দিন বাংলাদেশে যেখানে পড়ছেন সেখানেই ভালভাবে পড়াশোনা শেষ করুণ।

উপরের লেখাগুলি তাদের জন্য প্রযোজ্য নয় যারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। কারণ আপনারা এর চেয়ে কম খরচে পৃথিবীর কোথাও পড়াশোনা শেষ করতে পারবেন না। তারপরেও এদের মধ্যে কেউ যদি যেতে আগ্রহী হন তাহলে উপরের কেলকুলেসন মোতাবেক আগানোর চেষ্টা করুণ।

বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট দের উদ্দেশে

এবার মাস্টার্স করতে যাবে এমন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কিছু কথা বলে রাখি, মাস্টার্স করার জন্য ইউরোপে যাচ্ছেন উদ্দেশ্য হল ভাল মানের ডিগ্রি এবং পরবর্তীতে মানসম্মত চাকুরী।

একটি কথা বলেছিলাম, এইচএসসি পাসের পরের সময়টি একজন শিক্ষার্থীর ক্রুসিয়াল সময়। ছাত্রজীবনে আরও একটি ক্রুসিয়াল সময় রয়েছে, সেটা ব্যাচেলর সম্পন্ন হবার পর থেকে শুরু হয়। বুঝতে পারছেন কোন বিষয়টি কে নোটিস করছি জ্বি চাকরি পাবার প্রিপারেশন সময়টাকে বুঝচ্ছি।

ইউরোপে মাস্টার্স করার পরিকল্পনা শিক্ষার্থী মূলত অনার্স ৩য় বর্ষে পড়াশোনা কালীন সময়ে নিয়ে থাকে। Higher Study Abroad পদক্ষেপের আগে অবশ্যই কিছু বিষয় মাথায় নিতে হবে। দেখুন আপনি যখন ইউরোপে মাস্টার্স প্রোগ্রামে যাবেন তখন আপনার বয়স ২৪-২৫ বছর থাকবে। এই বয়সে যেখানে আপনার বন্ধুরা ভাল চাকুরীর পাবার নেশায় রাত দিন পড়াশোনা করছে সেখানে আপনি চলে যাচ্ছেন ইউরোপে। এটা আমি বিশ্বাস করি একজন সাধারণ মানের ছাত্র অনার্স ৩য় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন হবার পরের ১ বছর পর্যন্ত চাকরির জন্য পড়াশোনা করলে সে ছাত্র অবশ্যই ব্যাংক, বিসিএস, নন ক্যাডার সহ বিভিন্ন পর্যায়ের সম্মানজনক পদবির পেশায় নিযুক্ত হতে পারে।

মূল কথায় ফিরে যাই ২৫ বছর বয়সে আপনি চলে গেলেন ইউরোপে এবং কোর্স সম্পন্ন হবার পর আপনার বয়স হবে ২৭। বিভিন্ন জনের মতামত অনুযায়ী দেখা যায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা ইউরোপীয় ডিগ্রি অর্জনের পরেও স্ব স্ব ইউরোপীয় দেশে সে অনুযায়ী চাকুরী পাচ্ছে না। এর কারণ স্ব স্ব ইউরোপীয় দেশের ভাষা আয়ত্ত করতে না পারা। তাছাড়া ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর জন্য আপনাকে ধৈর্য রাখতে হবে, পাশাপাশি ভাষাশিক্ষার উপর জোর দিতে হবে তবেই মিলবে ভাল মানের চাকুরী। অনেকে এই সময় বিভিন্ন কারণে একেবারে বাংলাদেশে চলে আসে।

যদি এমনটা বাস্তবে হয় তখন দেশে আসার পর আপনার বয়স থাকবে ২৮-২৯ বছর। তখন দেখবেন আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা ইতিমধ্যে স্ব স্ব জায়গায় ভাল পদে নিযুক্ত হয়ে গিয়েছে আর আপনি চাকুরী পাবার প্রিপারেশন নিচ্ছেন। ঐ সমটাতে আপনার মানসিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, আপনি কি সামনের দিকে এগিয়ে যাবার মনোবল পাবেন? সর্বশেষ ফলাফল এমন হতে পারে , আপনার এত বড় ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানের একটি বেসরকারি চাকরি করছেন। ইউরোপে মাস্টার্স সম্পন্নের পরিকল্পনা ভেবে চিন্তে নিবেন।

Why Study Abroad is Important

  • উচ্চ মান ডিগ্রি লাভের সুযোগঃ ইউরোপে উচ্চশিক্ষা লাভের ফলে একজন শিক্ষার্থী উচ্চমান সম্মত ডিগ্রী নিতে পারে। যা তার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে অনেকাংশে এগিয়ে।
  • সহজে রিসার্চ এসিস্টেন্ট কিংবা ডক্টরাল প্রোগ্রামে স্কলারশিপের সুযোগঃ বাংলাদেশি একজন শিক্ষার্থী যখন তাঁর মাস্টার্স কোন একটি ইউরোপীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন করবে, পরবর্তীতে ডক্টরাল প্রোগ্রাম বা রিসার্চ এসিস্টেন্ট হিসেবে নিয়োগ পেতে তাঁর খুব একটা বেগ পেতে হবে না।
  • বাংলাদেশে পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগঃ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় শিক্ষক নিয়োগে একটি প্রশ্ন করা হয় যে আপনার কোন প্রকার বাইরের ডিগ্রী রয়েছে? যদি রিসেন্ট কেউ বাংলাদেশে কোন পাবলিক বা ভাল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার  জন্য ভাইভা দিয়ে থাকেন তাঁরা হয়ত এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। যদি আপনার এইরুপ একটি মাস্টার্স বা ডক্টরাল ডিগ্রী থেকে থাকে তাহলে অবশ্যই বাকি ক্যান্ডিডেট থেকে আপনি এগিয়ে থাকবেন।
  • বিশ্বের নামীদামী কোম্পানি তে ইন্টার্নশিপ এর সুযোগঃ ইউরোপীয় পাবলিক বা ভাল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলি তাঁদের শিক্ষার্থীদের বড় বড় মাল্টিনেসনাল কোম্পানিতে ইন্টার্নশিপের সুযোগ করে দেয়। এই ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ ঘটে। ক্ষেত্রবিশেষ কিছু শিক্ষার্থীর সেখানেই চাকরির সুযোগ হয়।
  • রিসার্চ ভিত্তিক ভাল লেখক হবার সুযোগঃ আমরা জানি বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি কোর্সে আমাদের বিভিন্ন বিষয়ের উপর এসাইনমেন্ট তৈরি করতে হয়।অনেকে এই এসাইনমেন্ট তৈরির জন্য অনেক চাটুকারিতার সুযোগ নেয় বা কোন এক জায়গা থেকে হবহু একটি আর্টিকেল কে কপি পেস্ট করে  থাকি। এটা সত্যি দুঃখজনক, একজন শিক্ষার্থী বুঝতে পারে না যে সে নিজেকে কতখানি নষ্ট করছে। শুধু তাই নয় ব্যাচেলর বা মাস্টার্স প্রোগ্রামের শেষ সময়ে ইন্টার্নশিপ রিপোর্ট বা থিসিস রিপোর্ট নীলক্ষেত বা কোন অনলাইন আর্টিকেল থেকে নিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছি। এর ফলে একজন লেখক হয়ে গড়ে উঠার স্কিল অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছি।

অন্যদিকে ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই বিষয়টি শুরু থেকে শক্ত হাতে পর্যালোচনা করে। আপনি ইচ্ছা করলেই        কোন  এক জায়গা থেকে কোন কিছু কপি করে নিজের নামে চালাতে পারবেন না, এবার হোক সেটা ১০ পেইজের বা ১০০ পেইজের এসাইনমেন্ট। বিশেষকরে এশিয়ান শিক্ষার্থীদের মেটেরিয়াল ভালভাবে প্লেইজিরিজম চেক করা হয়। সুতরাং আপনি না চাইলেও আপনাকে একজন দক্ষ লেখক হিসেবে গড়ে উঠতেই হবে।

  • প্রচুর তথ্য জানার সুযোগঃ ইউরোপীয় আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আপনি প্রচুর তথ্য জানার এবং বোঝার সুযোগ পাবেন।
  • স্পিকিং স্কিল বা প্রেসেন্টেশন স্কিল উন্নত করার সুযোগঃ প্রতি সেমিস্টারে প্রতিটি বিষয়ের উপর সেমিনার রয়েছে, সেখানে সিলেক্টেট টপিক নিয়ে আলোচনা করতে হয়, তাছাড়া ফাইনাল ডিপ্লোমার জন্য একটি ফাইনাল সেমিনারের আয়োজন করা হয় যেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থীরা উপস্থিত থাকে।

Higher Study Abroad ভর্তির শর্ত গুলি কি কি

ইউরোপীয় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির শর্ত ভিন্ন ভিন্ন এবং প্রতিটি ফ্যাকাল্টির ভর্তির শর্ত ভিন্নতা রয়েছে। তাই আমি আপনাদেরকে বলব ভর্তির শর্ত জানতে হলে অবশ্যই আপনাকে স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ভিজিট করতে হবে এবং আপনাদের সুবিধার্থে আমি নিম্নে সাধারণত ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির শর্তাবলী কি কি হতে পারে এর বিস্তারিত আলোচনা করছি।

  • বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি আবেদন ফর্ম। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করে নিতে হয়।
  • ব্যাচেলর কোর্সে ভর্তির জন্য এসএসএসি সর্বনিম্ন ৩.০০ এবং এইচএসসি সর্বনিম্ন ৩.০০ পয়েন্ট থাকতে হবে। মাস্টার কোর্সে ভর্তির জন্য অনার্স ফলাফল সর্বনিম্ন ২.৫০ আউট অব ৪.০০ অথবা সেকেন্ড ডিভিশন থাকতে হবে।
  • ব্যাচেলর কোর্সে ভর্তির জন্য এসএসএসি, এইচএসসি সার্টিফিকেট, মার্কস সিট, মাস্টার কোর্সে ভর্তির জন্য অনার্সের সার্টিফিকেট এবং মার্কস সিট ( অবশ্যই আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সাম কন্ট্রোলার, এডুকেশন মিনিস্ট্রি, লো মিনিস্ট্রি, ফরেন মিনিস্ট্রি অব বাংলাদেশ কর্তৃক সত্তায়ন থাকতে হবে)
  • আপনার পূর্ববর্তী কাজের পোর্টফলিও (ক্ষেত্র বিশেষ চেয়ে থাকে)
  • আইইএলটিএস সর্বনিম্ন ৫.৫-৭.০ চেয়ে থাকে। তবে অল্প কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আইইএলটিএস এর পরিবর্তে আপনার ব্যাচেলর ইংরেজি মিডিয়াম অব ইন্সট্রাকশন সার্টিফিকেট গ্রহণ করে। ব্যাচেলর কোর্সে ভর্তির জন্য এই ধরনের ইংরেজি মিডিয়াম অব ইন্সট্রাকশন সার্টিফিকেট গ্রহণযোগ্য নয়। অনেকে জিজ্ঞেস করে আইইএলটিএস ছাড়া এডমিশন পাওয়া যাবে? জি আইইএলটিএস ছাড়া অল্প কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এখনো ভর্তির সুযোগ দিচ্ছে।
  • সিভি
  • মোটিভেশন লেটার( কোথাও থেকে চুরি করে লিখবেন না আপনার এই লেটার পর্যালোচনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব এক্সপার্ট টিম রয়েছে । সুতরাং নিজের জ্ঞান দিয়ে লেখার চেষ্টা করুণ)
  • ২ টি রিকোমেন্ডাসেন লেটার
  • স্কাইপ ইন্টার্ভিউ (কিছু বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যারা শুধুমাত্র আপনার কাগজপত্র পর্যালোচনা করে স্কাইপ ইন্টার্ভিউ ছাড়াই ভর্তির সুযোগ দেয়)
  • ভর্তি আবেদনের জন্য অবশ্যই সে সকল কোর্স নির্বাচন করবেন যার সাথে আপনার পূর্ববর্তী পড়াশুনার মিল রয়েছে। অন্যথায় চূড়ান্ত ভর্তি অনুমোদন হাত থেকে ফসকে যেতে পারে।
  • ভর্তি আবেদনে ফি: ২০-১০০ ইউরো পর্যন্ত।
  • ভর্তির রাউন্ড: বছরে ২ টি রাউন্ডে বা সেশনে ভর্তির আবেদন করা যায় প্রথম রাউন্ডের আবেদন জানুয়ারি থেকে মার্চ/এপ্রিল পর্যন্ত এরপরের রাউন্ড অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত।
  • উপরোক্ত কাগজপত্র গুলি পাঠানোর পূর্বে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিসান কমিটির কাছ থেকে জেনে নিন যে, কোন পদ্ধতিতে কাগজপত্র পাঠাতে হবে বাই ইমেইল নাকি বাই পোস্ট। এডমিসান কমিটির উল্লেখিত মাধ্যমে পাঠিয়ে দিন।
  • এরপর বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে টিউশন ফি পাঠাতে বলতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই পাঠাতে হবে (ভিসা রিফিউসড হলে ১ মাসের ভিতরে রিফান্ড পেয়ে যাবেন)

Higher Study Abroad ভর্তি সহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রশ্ন যেকোন প্রকার তথ্য জানতে এই পেইজে কমেন্ট করুণ, আশাকরি দ্রুত যথাযথ উত্তর পেয়ে যাবেন। আপডেট তথ্য বা পোস্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিয়ে এক্টিভ থাকুন।

 

মন্তব্যসমূহ

Facebook